অনেক অনেক দিন আগে এক গাঁয়ে এক কৃষক বাস করতো। তার নাম ছিল আমীর আলী। তার বেশ বয়স হয়েছিল। ছেলেমেয়ে ছিল তার ছয়টি। তিনটি পুত্র আর তিনটি কন্যা। তাদের মধ্যে আবদালী ছিল সবচেয়ে ছোট। তার বয়স তখন সাত বৎসর। আমীর আলীর জমিজমা ছিল যথেষ্ট। সে নিজে পরিশ্রমী। পুত্ররাও পিতার মত পরিশ্রমী হয়েছিল। তাদের ছিল গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ, ফল ভরা গাছ। মাঠভরা ফসল আর গোলাভরা ধান। তাদের বাড়ির মেয়েরাও ছিল কর্মঠ। কোন দুঃখ ছিলনা আমীর আলীর সংসারে। আমীর আলী ছিলেন ধার্মিক। সারাজীবন তিনি সংসারের স্বচ্ছলতার জন্য কাজ করেছেন। এবার চাই পরকালের সঞ্চয়। তাই তিনি হজ্বে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। হজ্ব করতে হলে তাকে যেতে হবে মক্কায়। পুত্রেরা গ্রামের অন্যান্য বয়স্ক লোকদের সংগে পরামর্শ করে পিতার মক্কা যাওয়ার ব্যবস্থা পাকপাকি করে ফেললো।
আগেকার দিনে যোগাযোগ ব্যবস্থা আজকের মত এত উন্নত ছিল না। মক্কা ছিল বহু বহু দূরের শহর। সেই আরব দেশে। জাহাজে সাত সমুদ্র পেরিয়ে তবে সে দেশে যেতে হত। হয়ত এক মাস কিংবা তারও বেশী সময় লাগতো। এই দীর্ঘ সময় সমুদ্র ভ্রমণ অনেকেই সহ্য করতে পারতোনা। কেউ কেউ অসুখে পড়তো। আবার কেউ বা চির বিদায় নিত। আজকাল তো মক্কা পৌঁছানো কয়েক ঘন্টার ব্যাপার। তখন ছিল জীবন মরণের প্রশ্ন। আমাদের দেশের বৃদ্ধ লোকেরাই হজ্বে যেত। কারণ হজ্ব করতে হলে জীবনের সব কর্তব্য সমাপন করে যেতে হয়। ছেলেমেয়েদেরকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করে একজন পিতাকে হজ্বে যেতে হয়। আমীর আলীর সব দায়িত্ব শেষ। কেবল একটি কাজ তার বাকি রইল। সেটি হল আবেদ আলী। সকলে তাকে ডাকতো আবদালী বলে। এই ছেলেটির বড় হওয়ার জন্য অপেক্ষা করলে আমীর আলীর আর যাওয়া হবেনা। তিনি আরও বৃদ্ধ হয়ে অথর্ব হয়ে পড়বেন। তাই মৌলবী সাহেবের পরামর্শ মত আমীর আলী, আবদালীকে তার জেষ্ঠ্য পুত্রের হেফাজতে রেখে গেলেন।
দেখতে দেখতে যাওয়ার দিন এসে গেল। গ্রামের সবাই তার বাড়িতে হাজির। আমীর আলী নয়ন ভরা জলে সবার কাছ থেকে বিদায় নিলেন। ছেলেরা পিতার সংগে ঢাকায় এসে জাহাজে তুলে দিল। নোংগর তুললো বিশাল জাহাজ। আল্লাহর নাম লয়ে যাত্রীরা অজানার উদ্দেশ্যে রওনা হল। যাত্রীদের কান্না দেখে আমীর আলীর ছেলেরা ভয় পেয়ে গেল। জাহাজে বসে আমীর আলীর মন কেমন করতে লাগলো। ছোট ছেলের মুখখানা কিছুতেই সামনে থেকে সরাতে পারছেনা। কারণ বাড়ি থেকে বের হবার সময় ছেলেকে তিনি দেখতে পাননি। আমীর আলীর ইচ্ছা ছিল এখনি ফিরে আসে। কিন্তু আর তো উপায় ছিল না। তার চোখের লোনা পানি সাগরের লোনা পানির সংগে একাকার হয়ে গেল।
আমীর আলী ছিলেন নিরক্ষর। লিখতে পারেন এমন যাত্রীর সংগে তার আলাপ হল। তাকে অনুরোধ করে আমীর আলী বড় ছেলের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখালেন। তার পুত্র কন্যা, পরিজন, বাড়িঘর, গরুছাগল, আজন্মের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে তিনি কিছুতেই যেতে চাচ্ছিলেন না। কেবলই মনে হচ্ছিল, আর হয়তো কোনদিন ফিরে আসা হবেনা। তবু পরকালের জন্য পূন্য লাভের আশায় বুক বাঁধেন। কয়েকদিন পর জাহাজ বোম্বাই বন্দরে নোঙর করে। তখন তিনি চিঠিটি ডাক বাক্সে ফেলার ব্যবস্থা করেন। চিঠি চলে আসে যথাসময়ে বাড়িতে। বাড়ির লোক, গ্রামের লোক, সকলে জড় হয় চিঠি শোনার জন্য। লেখা-পড়া জানা একজন লোক চিঠি পড়ে শোনায়। সাদা কাগজের উপর কালো কালো অক্ষর কেমন কথা বলে ওঠে। পাঠক পড়তে শুরু করে আমীর আলীর চিঠি।
বাপ জীবন আমার,
আবদালীকে সাবধানে রাখিও। কোদালে যেন পাও কাটেনা। পুষ্করিনীতে যেন পড়েনা। আমি মক্কা হজ্ব করিতে চলিলাম। তোমরা ভাল থাকিও।
ইতি - তোমার পিতা আমীর আলী
চিঠিতে আমীর আলীর তার মনের আবেগ প্রকাশ করলেন না। তার যে মক্কায় যেতে একদম ইচ্ছা করছেনা সে কথাটি লিখতে পারলেন না। সাত সমুদ্র পার হয়ে একদিন এক রোদ্র ঝলমল সকালে হজ্ব যাত্রীদের জাহাজখানি আরবের জেদ্দা বন্দরে ভিড়লো। যাত্রীরা তাদের জন্য নির্দিষ্ট যানবাহনে চড়ে মক্কায় পৌঁছালো। এত লোকের সমাগম সেখানে। কত দেশ বিদেশ থেকে লোক এসেছে। পুণ্য অর্জনের আশায়। আমীর আলী নিজের মানসিকতাকে ধিক্কার দিলেন। মনে মনে ভাবলেন কষ্ট হলেও তার জীবন সার্থক। পরকালের আর চিন্তা নেই। শেষ জীবন তার পরিজনের সংগে সুখেই কাটবে। অনেক আনুষ্ঠানিকতার ভিতর দিয়ে হজ্ব পালন শেষ হলো। এবার ঘরে ফেরার পালা। আমীর আলী অন্তর আনন্দে পুলকিত। বেশ কিছুদিন পরই আমীর আলীর জাহাজ ছাড়লো। পরিশ্রমী মানুষ তিনি। অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থ। শ্রমবিমুখ ছিলেন না কখনও। সেই জন্য হয়ত তার স্বাস্থ্য এই ভিন দেশে অন্য রকম পরিবেশে ভালই ছিল। হঠাৎ করে জাহাজে একদিন তার ঠান্ডা লেগে জ্বর হল। ভেবেছিলেন সেরকম কিছুই নয়। দু’চারদিনে সেরে যাবে। কিন্তু না তার জ্বর বাড়তে লাগলো। তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলেন। জাহাজের ডাক্তারের চিকিৎসায় তেমন কোন ফল হল না। দিনে দিনে অবস্থার অবনতি ঘটলো। তবু তার মনের জোর খুব বেশী। তার আশা আর কয়েকটি দিন মাত্র। তারপর তিনি পৌঁছে যাবেন তার চির পরিচিত পরিবেশে। আপন গৃহের সেই কোণটিতে, যেখানে তিনি শয়ন করেন গত ষাট বছর ধরে। তার মনে পড়ছে কেবল আবদালীর কথা। মনের আয়নায় আবদালীকে দেখতে পান তারই শয্যায়। প্রাণপ্রিয় পুত্র তার অপেক্ষায় ছটফট করছে। মাতৃহারা এই শিশুটি যেমন পিতার সান্নিধ্য ছাড়া আর কিছুই চায় না, সেরকম পিতাও যেন ছোট্ট শিশুটিকে স্বর্গের শান্তির দূত হিসাবে জ্ঞান করে। তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন বাকী জীবনে তিনি বাড়ি ছেড়ে একটি দিনের জন্যও আর কোথাও যাবেন না। আবদালীকে আর চোখের আড়াল করবেন না। হাজী আমীর আলীর অসুখ বিপদজনক অবস্থায় চলে যাচ্ছে। ডাক্তারদের শত চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। আমীর আলীর চেতনা লোপ পেল। অবচেতনে তিনি বাড়ি পৌঁছে গেলেন। মহা আনন্দে সকলের সংগে কোলাকুলি করছেন। কুশল বিনিময় করছেন। তার প্রিয় পুত্র তার কোলের কাছে। তার সুখের সীমা নেই। বাড়ি ভরা পুত্র কন্যা, আত্মীয়-স্বজন। খাওয়া-দাওয়া মহা ধুমধাম। হাজী আমীর আলীর জীবন ধন্য। তার ইহকাল, তার পরকাল সব সার্থক।
ডাক্তার ও অন্যান্য যাত্রীরা আমীরা আলীকে ঘিরে আছে। এমন সময় আমীর আলী শেস নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তার আর বাড়ি ফেরা হল না। নিরক্ষর হলেও অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন বহু মানুষ অপেক্ষা তিনি বুদ্ধিমান ছিলেন। আর ছিলেন অমায়িক, অন্তরটি ছিল কোমল। সকলের জন্য ভালবাসায় পূর্ণ । জাহাজ কেবল বোম্বাই বন্দর ছেড়ে এসেছে। সমুদ্র পথে যাত্রীর মৃত্যু হলে তাকে কবর দেয়া সম্ভব ছিল না। নিয়মানুযায়ী সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়া হত। হাজী আমীর আলীরও তাই হল। তিনি গভীর সমুদ্রে তার শেষ শয্যা গ্রহণ করলেন।
এদিকে সেদিন আমীর আলীর বাড়িতে পুকুরে মাছ ধরা হচ্ছিল। পুকুরে ছিল একটি ভেলা। সেই ভেলায় চড়ে মাঝ-পুকুরে জাল ফেলা হচ্ছিল। ধরা পড়লো এক বিরাট মাছ। মাছ ধরার উৎসব, খুশীর উৎসব। বিরাট হৈ চৈ বাড়িতে, পুকুর পাড়ে। এই আনন্দঘন পরিবেশে আবদালী ভেলায় বসে পিতাকে স্মরণ করছিল। ভেলাটি ছিল ভাসমান। হৈ চৈ এর মধ্যে আবদালী হঠাৎ শুনতে পেল পিতার কণ্ঠস্বর। তাকে যেন নাম ধরে ডাকছেন। স্পষ্টই তার পিতা। হয়ত বাড়ি এসে পৌঁছেছেন। কিছু ভাববার আগেই সে তীরে আসার জন্য পানিতে ঝাঁপ দিল। সাতার তার তখনও রপ্ত হয় নাই। সে ডুবে গেল। তাকে উদ্ধারের কাজ শুরু হল। উদ্ধারও করা হল। অল্প একটু পানি খেয়েছিল। সে তার পিতাকে দেখতে চাইল। পেল না। সে চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিল। সংগে সংগে তার ভাই বোন-সকলে কাঁদতে লাগলো। মুহূর্তে শোকের ছায়া নেমে এলো বাড়িতে। যেন কেউ এই মাত্র মারা গেল। আবদালী তার বাবার চিঠি পড়া শুনতে চাইল। সেই পত্র পাঠক আমীর আলীর চিঠি পড়ে শোনালো। সকলে স্তব্ধ হয়ে পত্র পাঠ শুনলো। ‘আবদালীকে সাবধানে রাখিও। কোদালে যেন পাও কাটে না, পুষ্করিনীতে যেন পড়ে না।’ এ যেন আমীর আলীর কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হলো। এ আওয়াজ সকলকে আবেগ আপ্লুত করে ফেললো। মাছ ধরার আনন্দঘন পরিবেশ বেদনার পরিবেশে রূপান্তরিত হল। ‘আবদালীকে সাবধানে রাখিও’ — এই মর্মস্পর্শী ও ব্যাকুল বাণী সকলের অন্তরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো। ভারাক্রান্ত হৃদয়ে, অশ্রুসিক্ত পড়শীরা নিজের নিজের গৃহে ফিরে গেল।
No comments:
Post a Comment